
আব্দুল্লাহ আল মামুন,রায়পুর (লক্ষীপুর)থেকে :
লক্ষ্ণীপুরের রায়পুর উপজেলায় প্রবহমান এক সময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী এখন স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল কর্তৃক অবৈধ দখল ময়লা -আবর্জনা ফেলে ভরাট করার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়,নদীর দুপাড়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অবৈধ জবরদখল করে স্থাপনা নির্মাণ, ময়লা আবর্জনা ফেলে পানির প্রবাহ বন্ধ করা, তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ কচুরীপানা জন্মে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং পানি নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এক সময়ের যৌবনবতী ডাকাতিয়া নদী এখন মৃতপ্রায়,পলি জমে ভরাট হওয়ায় ৭০ থেকে ৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীটি শুকনো মৌসুমে পানি শূন্য থাকছে ।
নদীর দখল হয়ে যাওয়া অংশ উদ্ধার, আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা, প্রয়োজনে তলদেশ খনন ও কচুরীপানা পরিস্কার করাসহ প্রয়োজনীয় সংস্কারের কোন উদ্যোগ না থাকায় একদিকে প্রভাবশালীরা নদীর পাড় দখল করে গড়ে তুলছেন দোকানপাট ও ঘরবাড়িসহ নানাবিধ স্থাপনা অন্যদিকে স্থানে স্থানে নির্বিচারে নদীতে ফেলা হচ্ছে নানারকম ময়লা আবর্জনা ।
পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ থাকায় ময়লা আবর্জনা পঁচে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র। আবার নদীর সিংহভাগই এখন কচুরিপানার দখলে। ফলে যে ডাকাতিয়া এক সময় নৌ চলাচলের জন্য বিখ্যাত ছিল সে ডাকাতিয়ায় নৌযান চলতে দেখতে পাওয়াটাই এখন বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার।
ঢাকা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও নৌ বন্দর হতে মালামাল পরিবহনের জন্য এক সময় পুরো রায়পুরবাসী এই নদী পথের উপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন এই নির্ভরতা নেমে এসেছে প্রায় শূণ্যের কোঠায়। কোথাও কোথাও নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ১৩০ ফুট প্রস্থের ডাকাতিয়া নদী এখন ৫০ থেকে ৬০ ফুটে এসে ঠেকেছে। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। ফলে এক সময়ের মহা গুরুত্বপূর্ণ ডাকাতিয়া নদীর গুরুত্ব এখন নেই বললেই চলে।
জানা যায়, ডাকাতিয়া নদী বাংলাদেশ ও ভারতের একটি আন্ত:সীমান্ত নদী। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের লক্ষ্ণীপুর, চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪১ কিলোমিটার ও গড় প্রস্থ ৬৭ মিটার। এ নদীর গতিপথ সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক নদীটির প্রদত্ত পরিচিতি : দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের নদী নং- ০৭। লোকমুখে জানা যায় এক সময় ডাকাতিয়া নদী তীব্র খরস্রোতা নদী ছিল। মেঘনার এই শাখা নদীতে মেঘনার উত্তাল রুপ ফুটে উঠত। স্রোতের তীব্রতায় প্রায়শই নদীর দু’পাড়ে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হত। নদীগর্ভে হারিয়ে যেত ঘর বাড়ি আর ফসলের মাঠ। নদীর স্রোতের তীব্রতায় প্রায়ই ঘটত নৌ-দূর্ঘটনা, সলিল সমাধি ঘটত বহু মানুষের। ডাকাতের মতো সর্বগ্রাসী হওয়ায় মানুষ এ নদীর নাম দেয় ‘ডাকাতিয়া নদী’।
এক সময় ডাকাতিয়া নদী ছিল লক্ষীপুর , রায়পুর, চাঁদপুর ও দক্ষিণ কুমিল্লার বেশ কয়েকটি উপজেলার মানুষের কাছে আশির্বাদ। এটি ছিল তাদের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা ও মালামাল আনা-নেয়ার প্রধান মাধ্যম। একসময় এই নদীপথ ব্যবহার করে ভোলা, বরিশাল, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, নারায়নগঞ্জ, নরসিংদী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মালামাল পরিবহন করা হতো। একস্থান হতে অন্যস্থানে যাতায়াতের জন্যও মানুষ ব্যবহার করতেন ডাকাতিয়া নদীপথ। ডাকাতিয়ায় চলাচল করত বড় বড় যাত্রীবাহী লঞ্চ, মালবাহী নৌকা ও ট্রলার। শুষ্ক মওসুমে নদীতীরের কৃষকরা ফসল আবাদের জন্য পেতেন ডাকাতিয়ার পানি। নদীতে ছিল দেশীয় মাছের প্রাচুর্য। এমনিভাবে ডাকাতিয়া ছিল এ অঞ্চলের বহু মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। এক সময় রায়পুর, চাঁদপুর ও কুমিল্লার মানুষের নিকট এ নদী আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হলেও কালের পরিক্রমায় এখন তা যেন এক পরিত্যক্ত জলাধার।
রায়পুর বাজারের ব্যবসায়ী ইব্রাহিম খাঁন বলেন,
একসময় আমরা দেখেছি - এই ডাকাতিয়া নদী দিয়ে বড় বড় মালবাহী ট্রলার - লঞ্চ যাতায়াত করতো, জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরতো- 'ডাকাতিয়া নদীতে এখন আর আগের মতো পানি নেই, এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। দ্রুত নদী খনন ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ কামনা করছি।
স্থানীয় জেলে করিম মাঝি বলেন, 'একসময় এ নদীতে মাছ ধরে আমাদের পরিবারসহ কয়েকশত পরিবারের সংসার চলত । কিন্তু এখন নদী ভরাট হয়ে খালে পরিণত হয়েছে। দখল ও দূষণের কারণে মাছও নেই, পানি নেই ডাকাতিয়া নদীতে। বাধ্য হয়ে আমদের বাবা - দাদাদের পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমরা চাই নদীটি দখলমুক্ত করে পুনর্খননের মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে যাতে আনা যায় তার জোর দাবি করছি প্রশাসনের নিকট ।
এ বিষয়ে জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তেমন কোনো ফলপ্রসূ ও নেতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান কাউছার বলেন,সুনির্দিষ্ট ভাবে জড়িত অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা আসার এক মাসের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানের নদী সংযোগ খালগুলো খনন ও সংস্কারের উদ্বোধন করায় আশার আলো দেখছে স্থানীয় বাসিন্দারা। ডাকাতিয়া নদী তার আগের প্রাণ ফিরে পাবে এই প্রত্যাশা সচেতন নাগরিকদের ।